এক হাতে বিশ্ব জয়ের গল্প - কেরলি টাকাস

কেরলি টাকাসের গল্প বাংলায়

আস্সালামুআলাইকুম বন্ধুরা, জীবন চলার পথে আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সময় নানা প্রতিকুলতার সম্মুখীন হই এবং এই প্রতিকূলতার কারণেই আমরা কোনো কোনো সময় ব্যর্থ হই, কিংবা আমাদের স্বাভাবিক জীবন চলার পথে কিছুটা ব্যঘাত ঘটে। আর সেই ব্যর্থতা বা না পাওয়ার গ্লানিতে ডুবে না থেকে নতুন উদ্যমে নতুনভাবে জীবনটাকে শুরু করার ইচ্ছা, চিন্তা এবং কর্মশক্তি আমরা হারিয়ে ফেলি। কিন্তু সেই না পাওয়ার ব্যথা, গ্লানি সব ভুলে ইচ্ছাশক্তিকে কর্মশক্তিতে রূপান্তরিত করে একাগ্রতা, অধ্যবসায়, নিষ্ঠা এবং হার না মানা প্রত্যয় দিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করে এবং সফল হয়ে পুরো বিশ্বের বুকে উদাহরণ হয়ে আছেন ইউরোপের হাঙ্গেরির একজন আর্মি। জিনি এক হাত দিয়েই অলিম্পিকে পরপর দু’বার পিস্তল শ্যুটিংয়ে স্বর্ণ জয়ের রেকর্ড করে গড়েছেন অনন্য কীর্তি।

হ্যা বন্ধুরা, ১৯১০ সালের ১০ জানুয়ারি, হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট শহরে কেরোলি টাকাসের জন্ম। পড়াশনা শেষ করেই তিনি যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। পিস্তল শুটিংয়ে বেশ আগ্রহ থাকায় তিনি নিয়মিত অনুশীলন শুরু করেন এবং মাত্র ২৬ বছর বসসেই তিনি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান দখল করে শ্রেষ্ট শুটার হিসেবে বিবেচিত হন।

কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল অলিম্পিকে স্বর্ণ জয় করা এবং তিনি নিজেকে তৈরি করছিলেন ১৯৩৬ সালের অলিম্পিকে স্বর্ণ জয়ের জন্যে। হাঙ্গেরিয়ান আর্মির নিয়মে শুধুমাত্র কমিশনাররা অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করতে পারতেন। একারণেই আর্মির একজন সার্জেন্ট হওয়ায় কেরোলির নাম দেওয়া হলো না ১৯৩৬ সালের অলিম্পিকে।

হতাশ না হয়ে কেরোলি লক্ষ্য ঠিক করলেন পরের অলিম্পিকে। কিন্তু ১৯৩৮ সালে এক আর্মি ট্রেনিংয়ের সময় তার ডান হাতে একটি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়, যে হাতের উপর নির্ভর করে স্বপ্ন দেখা অলিম্পিক জয়ের। হতাশা তাকে ঘিরে ধরতে শুরু করেছে, কিন্তু তিনি নিজেকে সকলের সান্ত্বনার পাত্র হিসেবে বেছে নিতে নারাজ ছিলেন, এক হাত হারালে কি হবে ? আরেক হাত তো আছে। আর তাই তিনি ১ মাস চিকিৎসার পর আবার অনুশীলন শুরু করলেন।

এক বছর পর, ১৯৩৯ সালে বিশ্ব পিস্তল শ্যুটিং চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হলে সকলকে অবাক করে দিয়ে কেরোলি তার একমাত্র অবলম্বন বাম হাতেই জিতে নিলেন প্রতিযোগিতা টি।
কিন্তু দুর্ভাগ্য যেন পিছু ছাড়ছিল না কেরোলির। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধের জন্যে বাতিল হয়ে গেল ১৯৪০ ও ১৯৪৪ সালের অলিম্পিক।

এবার হয়তো অনেকেই ভাবছেন, আর কত? এবার নিশ্চয় কেরোলির সকল স্বপ্নকে পেছনে ফেলার অপেক্ষা। কিন্তু কিছুই যেন তাকে থামিয়ে রাখতে পারে না তার লক্ষ্যবস্তু থেকে।
অবশেষে ১৯৪৮ সালে অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হল এবং তখন কেরোলির বয়স ৩৮। যেকোনো খেলায় নবীনদের সাথে প্রতিযোগিতা করা বেশ কষ্টসাধ্য। কিন্তু পুরো পৃথিবীকে অবাক করে দিয়ে যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে শ্যুটিংয়ে স্বর্ণ জয় করলেন কেরোলি। এই প্রাপ্তি যেন আনুষ্ঠানিকতা মাত্র, যার বীজ পোঁতা হয়েছিল অনেক আগেই।

অনেকেই ভাবতে পারেন, এবার হয়তো কেরোলি তার সাধনায় লাগাম টেনে ধরেছেন। কিন্তু কেরোলি সেই মানসিকতায় গড়া ছিলেন না। তিনি নতুন উদ্যমে লেগে পড়লেন ১৯৫২ সালের অলিম্পিকের জন্যে এবং সেবারও স্বর্ণ জয় করলেন তিনি।

সেই সময় পর্যন্ত অলিম্পিকে একই ইভেন্টে পরপর দু’বার স্বর্ণজয় ছিল কেরোলির তৈরি এক বিশ্বরেকর্ড। আর কেরোলি ছিলেন তৃতীয় এমন ব্যক্তি যিনি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও অলিম্পিকে স্বর্ণ জয়ের স্বাদ পেয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালের ৫ জানুয়ারি ৬৫ বছর বয়সে হার না মানা এ বীর মৃত্যুবরণ করেন।

আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে অনেক না পাওয়ার ক্রন্দন, আর্তনাদ এবং বিশাল এক অজুহাতের তালিকা। ‘পারব না’ বা ‘পারছি না’ শব্দগুলো ঢুকে গেছে আমাদের অস্থিমজ্জায়।
যদিও আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে পাওয়ার চাইতে না পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে চলেছে ঠিকই, কিন্তু চেষ্টা ও একাগ্রতার কাছে লক্ষ্যজয় কখনো অসম্ভব নয়।

কেরোলি তাই শুধু একজন অলিম্পিক বিজয়ী নন, তার জীবনী হলো চেষ্টা ও একাগ্রতা দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করার জ্বলন্ত উদাহরণ এবং তার এই হার না মানা জীবনী থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরাও এগোতে পারি আমাদের জীবনের লক্ষ্যের দিকে প্রতিকূলতার বাঁধ ভেঙে দিয়ে।

তো বন্ধুরা লেখাটি ভালো লাগলে বনবধূদের সাথে শেয়ার করুন।  প্রতিদিন ট্রিকিটক ভিজিট করে আমাদের সাথে থাকুন। ধন্যবাদ।

শেয়ার করুন
পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট