নিজের অপারেশন নিজেই করেছিলেন যে ডাক্তার

Leonid Rogozov - লিওনিড রগোজভ

২০১৮ সালে এসেও আজকাল পেপার-পত্রিকায় চোখ বুলালেই চোখে পড়ে ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় বা অবহেলায় রোগীর মৃতু, স্বজনের আহাজারী, বিক্ষোভ, ভাংচুর।
আজকাল উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ডাক্তারের অবহেলায় যাচ্ছে রোগীদের প্রাণ, সেখানে আজ থেকে প্রায় ৫৭ বছর আগেই সফলভাবে নিজের অপারেশন নিজেই করে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম সেল্ফ সার্জারির উদাহরণ তৈরী করেছিলেন লিওনিড রগোজভ নামের একজন বিখ্যাত শল্য-চিকিৎসক। আজকের ভিডিওটি সেই বিখ্যাত ব্যক্তিকেই নিয়ে।

সময়টা ১ লা মে, ১৯৬১ সাল, বেলা ঠিক দুপুর ২ টো হলেও বাহিরে তীব্র ঠাণ্ডা এবং বিরামহীন তুষার পড়ছিল। স্থানটি যে আন্টার্টিকায় সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীন নোভোলাজারেভস্কায়া মেরু গবেষণা কেন্দ্র।

লিওনিড রগোজভ, ২৭ বছরের যুবক, পেটের ডানপাশের তলার দিকটা ফুলে টনটন করছে, প্রচন্ড জ্বর সাথে বমিবমি ভাব। সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনে ১৩ জনের এই গবেষণা দলের তিনিই একমাত্র ডাক্তার সদস্য হয়ে এসেছেন প্রাণহীন এই বরফের উপত্যকায় এবং তা প্রায় আটমাস হল। লক্ষণ দেখে তিনি একপ্রকার নিশ্চিত ছিলেন যে এটি অ্যাপেন্ডিসাইটিস।

অ্যাপেন্ডিসাইটিস এমন কিছু মারাত্মক ব্যাপার নয়, তবে ফেটে গিয়ে সংক্রমণ হওয়া এড়ানোর একটাই উপায় হল সার্জারি করে ওটাকে কেটে বাদ দেওয়া। সমস্যাটা এখানেই, সার্জারি করবে কে? কাছাকাছি এবং একমাত্র সাহায্য বলতে ষোলশ কিমি দূরের মিরনি গবেষণা কেন্দ্র, কিন্তু মারাত্মক মরুঝড়ের কারণে কোনো প্রকার উড়ানের সুবিধা না থাকায় সেখানে পৌঁছানোর সহজ কোনো উপায় ছিল না।

অগত্যা, সিদ্ধান্তটি নিয়েই ফেললেন লিওনিড। কি আর করার, নিজের সার্জারি নিজেই করবেন তিনি। সহকারী হিসেবে রইলেন এক আবহবিৎ আর এক ড্রাইভার। একজন ছুরি, কাঁচি ইত্যাদি ধরিয়ে দেবেন এবং অন্যজন লিওনিড এর সামনে ধরে থাকবেন একটি আয়না।
অতঃপর আধশোয়া হয়ে ডানদিকের তলপেটের দশ বারো সেমি পেটের চামড়া, তলার ফ্যাসা ও পেশী ইত্যাদি নিয়মমাফিক কেটে পৌঁছে গেলেন অকুস্থলে। আয়না দেখে কাটতে গিয়ে কেটে ফেললেন বৃহদান্ত্রের কিছুটা। মাথা ঠাণ্ডা রেখে নিজেকেই সেটা সেলাই করতে হল এবং ইতিমধ্যে তার মাথাটা বেশ ঝিমঝিম করছে।

যাই হোক, অবশেষে অ্যাপেনডিক্সটা তিনি দেখতে পেলেন। গোড়ার কাছটা কালো হয়ে ঢোল হয়ে আছে। ওটাকে সাবধানে কেটেকুটে সব সেলাই করতে চারটে বেজে গেল, আর পৃথিবীর প্রথম সেল্ফ সার্জারির উদাহরণ তৈরী হয়ে গেল সেই দিন।

মারাত্মক ঠান্ডায় সংক্রমণ না হওয়ার সুবিধায় দুই সপ্তাহের মধ্যেই লিওনিড একেবারে সুস্থ হয়ে গেলেন। তবে খবরটা ছড়িয়ে পড়ল এবং বেশ আড়োলন সৃষ্টি হল, বিশেষত নিজের দেশে। সোভিয়েত সরকার ওই বছরই 'অর্ডার অফ দ্য রেড ব্যানার অফ লেবার' সম্মানে ভূষিত করলেন লিওনিড রগোজভকে।

অতঃপর ১৯৬২ সালের অক্টোবরে অভিযান শেষ করে দেশে ফিরে এম, ডি করলেন সার্জারিতে এবং সেন্ট পিটার্সবার্গ রিসার্চ ইনস্টিটিউটে সার্জারি বিভাগের হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট হলেন তিনি।
দুহাজার সালে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গেই মৃত্যু হয় বিখ্যাত এই সার্জনের। এমনি যোগ্যতাসম্পন্ন চিকিৎসকই আমাদের কাম্য যাতে ভুল চিকিৎসায় আর একটিও প্রান না যায়।

শেয়ার করুন
পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট